যারা ব্রণের সমস্যা মোকাবেলায় কৃত্রিম প্রসাধনী ব্যবহার করতে চান না তারা ব্রণ দূর করতে গোলাপজলের ব্যবহার করে দেখতে পারেন। গোলাপজল সাধারণত রাসায়নিক ভরা পারফিউমের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যা ত্বকের তেলের ভারসাম্য বজায় রাখে, ত্বককে হাইড্রেট রাখে, ত্বক মসৃণ এবং কোমল রাখার পাশাপাশি ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে।
গোলাপ জল এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এতে রয়েছে অ্যান্টি-ব্যাকটরিয়াল উপাদান। যা ত্বক গভীর থেকে পরিষ্কার করার পাশাপাশি ত্বকের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এতে বিদ্যমান এন্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান ত্বক গভীর থেকে পরিষ্কার করার সময় ব্রন সৃষ্টিকারী উপাদান গুলোকে মেরে ফেলে।
ফলে ব্রণের প্রকোপ কমার পাশাপাশি ত্বক টানটান থাকে। যার ব্রণ দূর করতে গোলাপ জলের ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাচ্ছেন তারা আমাদের সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন।
গোলাপ জল
গোলাপজল সাধারণত গোলাপ ফুলের পাপড়ি থেকে তৈরি করা হয়। এই সুরভীত জল যখন পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গোলাপ তেল বের করা হয় তখন উপজাত হিসেবে গোলাপ জল তৈরি হয়। পারস্যের রসায়নবিদ আভিসেন্না পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আধুনিকভাবে গোলাপজল তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। গোলাপের সিরাপ তৈরি করতে চাইলে গোলাপ জলের সাথে চিনি মিশিয়ে তৈরি করা যায়। ইউরোপ এবং এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন খাবারে সুগন্ধের জন্য গোলাপ জল ব্যবহারের চর্চা রয়েছে। প্রাকৃতিক সুগন্ধি হিসেবে এখন বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হলেও এর উৎপত্তিস্থল হলো ইরান। এর বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতার জন্য বিভিন্ন পানীয়তে এখন গোলাপ জল ব্যবহৃত হয়।
ব্রণ দূর করতে গোলাপ জলের ব্যবহার
গোলাপ জল দিয়ে ব্রণ রাতারাতি দূর করা যায় না। এর জন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে। চলুন জেনে নেই ব্রণ দূর করতে গোলাপজলের ব্যবহার কেমন হবে?
গোলাপ জল ও কমলালেবুর খোসা
কমলালেবুর খোসা রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে নিয়ে এই গুঁড়ো এর সাথে পরিমাণ মতো গোলাপজল মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করে নিন। ১৫ মিনিট লাগিয়ে রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলে ব্রণ কয়েক দিনে দূর হবে।
গোলাপ জল ও চন্দন
পরিমাণ মতো চন্দনগুলো এর সাথে গোলাপজল মিশিয়ে ত্বকে লাগালে ত্বকের ব্রন দূর হয় এবং ব্রণ সৃষ্টিকারী উপাদান গুলো কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
গোলাপ জল ও মুলতানি মাটি
তিন চা চামচ গোলাপজল এর সাথে এক চা চামচ মুলতানি মাটি মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করে ত্বকে ১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। এটি ত্বকের যাবতীয় সংক্রমণ দূর করতে সাহায্য করে।
গোলাপজল ও আদাবাটা
পরিমাণ মতো আদাবাটা এর সাথে সামান্য পরিমাণ গোলাপ জল মিশিয়ে একটি ফেসপ্যাক তৈরি করুন। এই ফেস প্যাকটি ত্বকে অন্তত ১০ মিনিট লাগিয়ে রেখে উষ্ণ গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললে ব্রণের সমস্যা থেকে খুব দ্রুত রেহাই পাওয়া যায়।
দই, ওটমিল, লেবুর রস ও গোলাপ জল
১ টেবিল চামচ দই, ১ টেবিল চামচ ওটমিল, ১ টেবিল চামচ গোলাপজল এর সাথে কয়েক ফোটা লেবুর রস মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করুন। শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে ব্রণ দূর হবে নিমিষেই।
গোলাপজল ও ভিনেগার
পরিমাণ মতো গোলাপজলের সাথে সামান্য কয়েক ফোটা ভিনেগার যোগ করে ত্বকে লাগালে ত্বকে পিএইচ ভারসাম্য বজায় থাকে। ত্বকের সংবেদনশীলতা দূর করার পাশাপাশি ব্রণের প্রকোপ কমায়।
গোলাপ জল মুখে কিভাবে ব্যবহার করব
গোলাপ জল মুখে ব্যবহার করার জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি নিয়ম রয়েছে। গোলাপ জল মুখে কিভাবে ব্যবহার করবেন তা জানার জন্য সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন:
- গোলাপজল ও অ্যালোভেরা জেল এ বিদ্যমান অ্যান্টিসেপটিক এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান মশ্চারাইজার এর কাজ করে থাকে। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে এই উৎপাদন দুটি ব্যবহার করুন।
- মেকাপের আগে টোনার হিসেবে গোলাপ জল ব্যবহার করতে পারেন।
- গোলাপজল মশ্চারাইজার হিসেবে ব্যবহার করলে ত্বকের মৃত কোষ দূর হয়।
- রাতে তুলার সাহায্যে গোলাপজল মিশিয়ে মুখে লাগালে ph ভারসামও বজায় থাকে।
- মেকাপ পরিষ্কার করার সময় গোলাপ জল ব্যবহার করলে ত্বক কোমল থাকে।
- গোলাপ জলের সাথে এলোভেরা জেল ব্যবহার করলে হাইপারপিগমেন্টেশন এর সমস্যা দূর হয়।
- গোলাপজল এর সাথে ভিনেগার ব্যবহার করলে ত্বকের বলিরেখা দূর হয়।
- গোলাপ জলের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে ত্বকে ব্যবহার করলে ব্রণের সমস্যা চিরতরে দূর হয়।
- গোলাপ জলের সাথে আদা বাটা মিশিয়ে মুখে ব্যবহার করলে ত্বক যাবতীয় ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।
গোলাপ জলের সাথে কি কি উপাদান মেশানো যাবেনা
গোলাপ জলের সাথে কিছু উপাদান মেশানো যেমন ত্বকের জন্য খুবই ভালো তেমনি গোলাপ জলের সাথে কিছু উপাদান মেশানো ত্বকের জন্য খুবই ক্ষতিকর। চলুন জেনে নেই গোলাপ জল এর সাথে কি কি মেশানো যাবে না?
- গোলাপজল এর সাথে কোন প্রকার এসেন্সিয়াল অয়েল ব্যবহার করা যাবে না,
- গোলাপজল এর সাথে উইচ হেইজল ব্যবহার করলে ত্বক শুষ্ক এবং সংবেদনশীল হয়,
- গোলাপজল এর সাথে কোন ব্রান্ডের বেইকিং সোডা ব্যবহার করা যাবে না। এতে করে ত্বকে পিএইচ এর ভারসাম্য নষ্ট হয়,
- গোলাপজল এর সাথে লেবুর রস ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। লেবুর রস বেশি পরিমাণে ব্যবহার করলে তোকে রেস্তোর ক্ষতিগ্রস্ত হয়,
বাইরে থেকে বাসায় ফিরে ফেশওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করার পর মুখে তুলার সাহায্যে গোলাপজল ব্যবহার করুন। রাতে ঘুমানোর আগে মুখে গোলাপজল লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। সকালে উঠে পরিষ্কার পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলতে পারেন। এছাড়া মেকআপ পরিষ্কার করার পর ত্বকে গোলাপ জল লাগাতে পারে।
আরো পড়ুন: ব্রণের জন্য নিম পাতার ব্যবহার
গোলাপজল ব্যবহারের নিয়ম

যে কোন সাধারণ অথবা নরমাল ত্বকে গোলাপজল ব্যবহার করা যাবে যেকোনো সময়। তবে কিছু কিছু ত্বক যেমন: সংবেদনশীল ত্বক, অতিরিক্ত তৈলাক্ত ত্বকের জন্য গোলাপজল উপযোগী নয়। ‘ডার্মাক্রাশ মেডিকেল অ্যাস্থেটিক্স’য়ের পরিচালক ম্যারি বেইকার বলেন, যেসব ত্বকে লালচে ভাব অথবা ফোলা ভাব রয়েছে সেসব ত্বকের জন্য গোলাপজল অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া যেসব ত্বক আরোগ্য ক্ষমতা সমৃদ্ধ সেসব ত্বকে গোলাপজল ব্যবহারে খুব তাড়াতাড়ি উপকার পাওয়া যায়।
যাদের ত্বক মিশ্র প্রকৃতি তারাও দিনের যেকোনো সময়ে গোলাপ জল ব্যবহার করতে পারবেন। যেকোনো ত্বকের ব্যক্তিরা গোসলের আগে গোলাপ জল ব্যবহার করে গোসলের পর ত্বকে পছন্দমত ক্রিম, লোশন ব্যবহার করতে পারবেন। মেকাপের পর গোলাপ জল ব্যবহার করলে ত্বকের শুষ্ক ভাব দূর হয়। অতিরিক্ত তৈলাক্ত ত্বকে গোলাপ জল ব্যবহার করলে তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে আসে। যারা গোলাপ জল ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছিলেন আশা করছি তারা বিস্তারিতভাবে তথ্যটি জানতে পেরেছেন।
উপসংহার
সৌন্দর্য সচেতন ব্যক্তিরা বহু আগে থেকেই ব্রণ দূর করতে গোলাপ জলের ব্যবহার করে আসছেন। যারা বাইরের ক্ষতিকর কেমিক্যালযুক্ত প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে চান না তারা নিয়মিত ত্বকে গোলাপজল ব্যবহার করুন। এক্ষেত্রে একটি ভালো ব্রান্ডের গোলাপজল ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বাজারে পাওয়া লোকাল গোলাপজল ত্বকের উপকারের বদলে ক্ষতি করে বেশি। তাই ত্বকের জন্য ভালো মানের গোলাপ জল বাছাই করুন।
১)রাতে মুখে গোলাপ জল দিলে কি হয়?
উঃ রাতে মুখে গোলাপ জল দিলে ব্রণ দূর হয়, ত্বকের শুষ্কতা দূর হয়, অতিরিক্ত তেল নিয়ন্ত্রণ করে, রোদে পোড়া দাগ দূর করে।
২)গোলাপ জল কি ব্রণ দূর করতে পারে?
উঃ গোলাপজল এর সাথে এলোভেরা জেল, ওটমিল, আদা বাটা, মুলতানি মাটি ইত্যাদি একসাথে মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করে ত্বকে লাগালে ব্রণ কয়েক দিনেই দূর হয়।
৩)ছত্রাকের ব্রণের জন্য গোলাপ জল কি ভালো?
উঃ গোলাপজল এর সাথে আদাবাটা মিশিয়ে ত্বকে ব্যবহার করলে ত্বকে যাবতীয় ছত্রাকের সমস্যা দূর হয় এবং ব্রণ নিয়ন্ত্রণে আসে।